নাবীল অনুসূর্য

প্রেম ও প্রগতির প্রদীপ প্রজ্বলনে প্রয়াসী

ভালোবাসার আশ্চর্য ‘মেঘদল’

বাংলাদেশের ব্যান্ড জগতে যে গুটিকয়েক রক ব্যান্ড নিজস্ব ঢং বা টোন তৈরি করতে পেরেছে, আরও স্পষ্ট করে বললে পশ্চিমা রক ধারার সঙ্গে ঢাকার বা বাংলাদেশের ছোঁয়া বা টোন মেলাতে পেরেছে, মেঘদল তাদের অন্যতম। তাদের দাবি, ‘লালনের দেশে’ গান করতে পেরে তারা গর্বিত। তাদের প্রথম অ্যালবাম ‘দ্রোহের মন্ত্রে ভালোবাসা’ মুক্তি পায় ২০০৫ সালে। আর তাদের দ্বিতীয় অ্যালবাম ‘শহরবন্দি’ আসে ২০০৯ সালে।

মেঘদল গঠিত হয় অবশ্য ২০০২ সালে। তবে ব্যান্ডটির গল্পের শুরু আরও আগে। বলা যায় ২০০০ সাল থেকে এটির গঠন প্রক্রিয়ার শুরু। তখন থেকেই তারা কয়েকজন একসাথে গান করতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর চারুকলার বিভিন্ন কনসার্টে পারফর্ম করতেন। গাইতেন নিজেদের গান, অন্যদের গান। নানা আন্দোলনেও যুক্ত ছিলেন তারা। পরে সেই দলটিই মেঘদল নামে আত্মপ্রকাশ করে।

মেঘদল গঠিত হওয়ার পেছনের গল্পটি ওই কজনের একটি আড্ডার, কিংবা বলা যেতে পারে একটি কম্পোজিশনের। ‘ঔঁ’ কম্পোজিশনটি দিয়ে মূলত শুরু হয় মেঘদলের যাত্রার। গল্পটা ২০০২ সালের দিকের। তখন তাদের সেই আড্ডাবাজির দলে ছিলেন মেজবাউর রহমান সুমন, শিবু কুমার শীল, ব্ল্যাকের জাহান আর রম্য, চিন্ময় আর টুটুল। তারা এক সাথে অ্যানিমেশনের কাজ করতেন আজিজ মার্কেটের পাতালে, ৪০ গ্রাফিক্যাল ইকোতে। সারাদিন আড্ডা দিতেন টুকু মামার চায়ের দোকানে।

গ্রাফিক্যাল ইকোতে তারা প্রতিদিন সকাল সাতটা-আটটার মধ্যে হাজির হয়ে যেতেন, অন্য সবাই আসার আগেই। আর তারপর গানপাগল মানুষগুলো রেওয়াজ শুরু করতেন গিটার, খোল, করতাল, হারমোনিয়াম নিয়ে। তাদের সেই ‘পারলৌকিক কামরা’টির নাম তারা দিয়েছিলেন ‘এথেন্স’। সেই রেওয়াজের একটা অংশ হিসেবেই একদিন শিবু ‘ঔঁ’ গাইতে শুরু করেন। পরে সেই থিম থেকেই আস্তে আস্তে সবাই মিলে ‘ঔঁ’ কম্পোজিশনটি তৈরি হয়।

এরপর একদিন তারা অনুভব করলেন, তাদের একটি দল হিসেবে গান করা প্রয়োজন। তারা ব্যান্ডের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। সে জন্য জানুয়ারি মাসের ২২ তারিখ চারুকলার একটি কনসার্টকে নিলেন তাদের নতুন ব্যান্ডের আত্মপ্রকাশের মঞ্চ হিসেবে। একমাস টানা অনুশীলন চললো।

ব্যান্ডের নাম দিলেন শিবু, বোঁদলেয়ারের কাছ থেকে ধার করে- মেঘদল (আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল/ অচেনা মানুষ; শার্ল বোঁদলেয়ার)।

২০০৫ সালে বাজারে আসে ব্যান্ডটির প্রথম অ্যালবাম ‘দ্রোহের মন্ত্রে ভালোবাসা’। এমন না যে বাজারে এসেই তাদের অ্যালবাম একেবারে হুলুস্থুল ফেলে দিল, আর সেটা তারাও চাননি। তারা প্রচলিত ধারার বাইরে বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। একটি দল হিসেবে গান গাইতে চেয়েছিলেন। নিজস্ব গানের ঘরানা দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। আর তারা সবাই যে চারুকলার ছাত্র, সেই ছোঁয়াও রাখার চেষ্টা করেছেন অ্যালবামের সর্বত্র।

তারা যেহেতু প্রচলিত ধারার বাইরে বেরিয়ে এসে গান করেন, তাদের শ্রোতাশ্রেণীও তৈরি হলো প্রচলিত ধারার বাইরে। যারা ভিন্ন কিছু শুনতে চায়, নতুন কিছু শুনতে চায়। যাদের পছন্দের ব্যান্ডের তালিকায় পিঙ্ক ফ্লয়েড বা মহীনের ঘোড়াগুলি থাকে, মেঘদলও থাকে তাদের ট্র্যাকলিস্টে। স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপারটা তাদের বেশ আনন্দিত করে। পথচলার শুরুতে তাদের আকাঙ্ক্ষাটা তো এমনই ছিল।

আবার তাদের প্রিয় কিছু গান জনপ্রিয় না হওয়ায় তারা কিছুটা অতৃপ্তও হয়। অ্যালবামটির গানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয় ‘চেনা অচেনা’। কিন্তু তাদের সবচেয়ে প্রিয় গান ছিলো ‘ঔঁ’। এই গানটি ঠিক তাদের আশানুরূপ জনপ্রিয় হয়নি। উপরন্তু একটা কনসার্টে তারা গানটি পারফর্ম করতে গিয়ে কিছু দর্শকের বাধার মুখেও পরেন। ঘটনাটা ঘটে ২০০৭ সালে। গুলশান ইয়ুথ ক্লাবে টিআইবির একটি কনসার্টে তারা গানটি পারফর্ম করছিলেন। তখন দর্শকদের মধ্যে থেকে ৫০-৬০ জন হৈ চৈ জুড়ে দেন। বাকি দর্শকরা তো বটেই, এমনকি আয়োজক বা কনসার্টে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনিও তাদের বিরুদ্ধে কিছু বলেনি। বরং তাদেরকেই গানটি থামিয়ে দিতে বলা হয়। এরপর তারা বেশ কিছুদিন গানটি লাইভ শোতে পারফর্ম করা বন্ধ রাখেন।

২০০৭ সালে ‘নিয়ন আলোয় স্বাগতম’ শিরোনামের একটি মিক্সড অ্যালবামে তাদের একটি গান প্রকাশিত হয়। ‘নেফারতিতি’ শিরোনামের গানটি বেশ আলোচিতও হয়। আর ২০০৯ সালে মুক্তি পায় তাদের দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘শহরবন্দি’। এই অ্যালবাম পুরোটাই শহরের গল্প, ঢাকা শহরের গল্প। এই শহরের ভালোলাগা-ভালোবাসা আর সমস্যার গল্প। কিছু নাগরিক বোধ আর নাগরিক গল্প নিয়ে এর গানগুলো।

অ্যালবামটি নিয়ে, অ্যালবামের গানগুলো নিয়ে মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, “আমাদের দেশের শিল্পীদের মধ্যে যারা শহরকেন্দ্রীক বা নাগরিক গান করছেন, তাদের গানে কিন্তু আমাদের শহরটাকে বা আমাদের সময়টাকে ওভাবে পাওয়া যায় না। যেমন, কলকাতার কিছু সাধারণ গান শুনলেই কলকাতার জীবনটাকে অনুভব করা যায়। সেখানকার প্রেমের গান শুনলে ঢাকায় বসেই ওখানকার প্রেমকে উপলব্ধি করা যায়। আর আমাদের গানগুলো হয় খুব অ্যাবস্ট্রাক্ট ধরনের হয়, অথবা লিরিকস এতোই হালকা হয় যে সেটাকে যে কোনো শহর বা যে কোনো সময়ের মধ্যেই ফেলা যায়। গানগুলোতে হয়তো আমাদের ঢাকা শহরের প্রেমের গল্পই বলা হচ্ছে, কিন্তু আমাদের ঢাকা শহরকে সেখানে পাওয়া যায় না। যারা শাহবাগকেন্দ্রীক প্রেম করছে, তাদের গানেও শাহবাগকেও পাওয়া যায় না।”

অ্যালবামটিতে তাদের অন্যতম পছন্দের ট্র্যাক ছিল ‘ঠিকঠাক’। মেঘদলের প্রিয় এই গানটি ঠিকই শ্রোতাদের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। বিশেষত একেবারেই সিম্পল এই গানটির সিমপ্লিসিটিটা যে সাধারণ শ্রোতারা গ্রহণ করেছেন, এটি মেঘদলকে ভীষণ তৃপ্তি দেয়।

মেঘদল যে ঘরানায় গান করে, তাকে বলা যেতে পারে ‘থিয়েট্রিক্যাল রক’। তাদের অনেক গানেই আরো অনেক ঘরানারই ছোঁয়া পাওয়া যায়। তবে মেঘদলের দাবি তারা কোনো নির্দিষ্ট ঘরানায় গান করেন না। তারা স্রেফ গান করেন। তাদের গানে যদি কোনো কিছুর ছোঁয়া রাখতেই চান, সেটা ঢাকা শহরের ছোঁয়া। বাংলাদেশের ছোঁয়া। তাদের গান যাতে ঢাকা শহরের গান হিসেবে চেনা যায়। কিংবা তাদের গানের প্রেক্ষাপট হিসেবে যাতে ঢাকা শহরকে চিনে নেয়া যায়।

তাদের গানের ঘরানা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে শিবু কুমার শীল বলেন, “আমরা আসলে কোনো নির্দিষ্ট ঘরানা নিয়ে গান করি না। আমরা এমন কিছু করার চেষ্টা করছি, যেটা আগে কখনো হয় নাই। আবার অতীতে যেসব মায়েস্ত্রোরা গান করে গেছেন, আমরা তাদের কাছেও ঋণী। তার মধ্যে দিয়েই আমাদের কম্পোজিশনগুলোকে আমরা মৌলিকভাবে করার চেষ্টা করছি। সেটা আসলে শেষ পর্যন্ত কোন ঘরানায় গিয়ে দাঁড়াল সেটা এখনো আমরা বিচার করতে বসি নাই। আমরা এখন শুধুই গান করে যাচ্ছি।”

ভক্তদের চাওয়াও ঠিক সেটাই। মেঘদল শুধুই গান করে যাক। মেঘদলের নতুন নতুন গান আসুক। মেঘদলের প্রথম ও দ্বিতীয় অ্যালবামের মাঝে ৪ বছরের ব্যবধান। দ্বিতীয় অ্যালবাম প্রকাশের পর পেরিয়ে গেছে অর্ধযুগ, এখনো তৃতীয় অ্যালবাম আলোর মুখ দেখেনি। তবু কিন্তু ভক্তরা ঠিকই অপেক্ষা করে আছে। তবু তারা ওটুকুই চায়- মেঘদল গান করুক।

 ব্যান্ড লাইনআপ

মেজবাউর রহমান সুমন: কথা, সুর, কণ্ঠ
শিবু কুমার শীল: কথা, সুর, কণ্ঠ
শোয়েব: লিড গিটার, অ্যাকোস্টিক গিটার, সাইড ভোকাল (হারমোনাইজেশন)
আমজাদ: ড্রামস
কিবরিয়া: বেস গিটারিস্ট
রনি: কিবোর্ডিস্ট

সাবেক সদস্য
মাসুদ হাসান উজ্জ্বল: কথা, সুর, কণ্ঠ (দ্রোহের মন্ত্রে ভালবাসা)
সৌরভ: বাঁশি, পারকাশন (দ্রোহের মন্ত্রে ভালবাসা, শহরবন্দী)
জয়: ড্রামস (দ্রোহের মন্ত্রে ভালবাসা)
আসাদ (নগরবাউল): কিবোর্ডিস্ট (দ্রোহের মন্ত্রে ভালবাসা)

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

সংগ্রহ করুন